Thursday, July 26, 2012

হুমায়ূন মার্ডার- ঘাতক শাওন ও মাজহারুল ॥ নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার অনুসন্ধান

গতকাল নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকায় লেখা হয়েছে ড. হুমায়ূন আহমেদ ক্যানসারে মারা যাননি। 

রক্তের সংক্রমণই তার অকাল মৃত্যুর কারণ। বাসায় ফেরার একদিন পর তিনি চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক হাসপাতালে না নিয়ে জননন্দিত এই ব্যক্তিত্বকে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় একদিন পর নেয়া হয় জ্যামাইকার কুইন্স মেডিকেল সেন্টারে। এরপরই যত জটিলতা। তার এই  অকাল মৃত্যুকে হত্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

অথচ ওই হাসপাতালটিতে হুমায়ূনের চিকিৎসা বা অপারেশন করা হয়নি। এ ছাড়াও নিউইয়র্কে হুমায়ূনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যভাবে রাখা হয় রহস্যজনক কারণে। হুমায়ূনের এ অকাল মৃত্যুকে হত্যার সঙ্গে তুলনা করেছে পত্রিকাটি। এ জন্য দায়ী করা হয়েছে শাওন ও মাজহারুলকে।

জানা গেছে, লেখক হুমায়ূন আহমেদের লাশ গোসল করানোর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে লাশের গোসল নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তিকে হেস্তনেস্ত হতে হয়েছে। অন্যের সাহায্য নিতে হয়েছে গোসল করানোর কাজে। ফিউনারেল হোমে হুমায়ূন আহমেদের লাশ পড়েছিল একা, অনাদরে অবহেলায়।

মাতমে অস্থির কাউকে তখন দেখা যায়নি প্রিয় ব্যক্তির কফিনের পাশে। আত্মীয় জামাল আবেদীন ও আনিসুর রহমান ছাড়া কেউ নেই। সাধারণত কেউ মারা গেলে লাশের পাশে সার্বক্ষণিক কাউকে রাখা হয়। দোয়া-কালাম পড়া হয় আত্মার শান্তি কামনা করে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের লাশের পাশে কেউ না থাকায় গোসলের পর মাত্র চার ব্যক্তিকে প্রথম মোনাজাত করতে হলো।

এসব নিয়ে এখন হাজারও প্রশ্ন সাধারণের মনে। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণি হুমায়ূন আহমেদ কেন এমন উপেক্ষার শিকার হলেন এর জবাব চান তার ভক্তরা। এ বিষয়ে জানতে গিয়ে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

একটি বিশ্বস্ত সূত্রমতে, গত ১২ জুন বেলভিউ হাসপাতালে অপারেশন হয় হুমায়ূন আহমেদের। অপারেশনের পর সবাই খুশি। চিকিৎসকরা বললেন, এটা ১০০% সফল অস্ত্রোপচার। মাত্র ৮ দিনের মাথায় ২০ জুন হুমায়ূন আহমেদকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হলে তিনি নিজেই পায়ে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে চড়ে ওজনপার্কের ভাড়া বাড়িতে ফিরে আসেন।

সূত্রমতে, বাড়ি ফেরার দিনই একটি পার্টি করা হয় হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে। সেখানে সব ধরনের গোশতসহ পানীয় ছিল। ক্যানসার অপারেশনের একজন রোগীকে এসব খাবার দেয়া সঠিক হয়েছে কি না তা নিয়ে রয়েছে অনেকের প্রশ্ন।

২১ জুন দুপুরে হুমায়ূন আহমেদ চেয়ার থেকে পড়ে যান। এটাই হয়েছিল তার জন্য বড় কাল। চেয়ার থেকে কীভাবে তিনি পড়লেন এটা কেউ জানেন না। পড়ে যাওয়ার কারণে অপারেশনস্থল আঘাতপ্রাপ্ত হয় মারাত্মকভাবে। এ নিয়ে সার্বক্ষণিক সঙ্গীরা কোনো ব্যবস্থা নেননি তাৎক্ষণিকভাবে। একদিন পর ব্যথায় কুকরে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ।

এ সময় মুক্তধারার প্রধান বিশ্বজিৎকে ফোন করেন শাওন। জানতে চান ডাক্তারের ফোন নম্বর। বিস্ময়কর বিষয় হলো, শাওন ও মাজহারুল ইসলামের কাছে জরুরি প্রয়োজনের জন্য ফোন নম্বরটিও ছিল না ড. হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসকের।

পরদিন অর্থাৎ ২২ জুন বিকেলে যখন ব্যথা চরম আকার ধারণ করে তখন একটি প্রাইভেট কারে করে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তারা রওনা হন হাসপাতালের দিকে। গাড়িতেই তিনি সংজ্ঞা হারান। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলে সংজ্ঞাহীন হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যাওয়া হয় জ্যামাইকায় অবস্থিত কুইন্স মেডিকেল সেন্টারের ইমারজেন্সি রুমে।

অবস্থা বেগতিক দেখে শেষে তাকে বেলভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তখন আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে রাতে লেখককে নিয়ে যাওয়া হয় বেলভিউতে। সেখানে যাওয়ার পরপরই অবস্থার ভয়াবহতা দেখে চিকিৎসকরা তাকে আবার অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন ২৩ জুন। এরই মধ্যে ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ।

সূত্র জানায়, হুমায়ূন আহমেদ মারাত্মক ইনফেকশনে আক্রান্ত হলেও সব সময়ই এটাকে ঢেকে রাখার একটি প্রবণতা ছিল। এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে হাজারও প্রশ্ন।প্রশ্ন উঠেছে, ১২ জুন যখন বেলভিউতে হুমায়ূন আহমেদের অপারেশন হচ্ছিল তখন তার স্ত্রী শাওন ও মাজহারের বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে। ড. হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ অপারেশনের সময় সেখানে উপস্থিত ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, বিশ্বজিৎ সাহাসহ আরো অনেকে ছিলেন উদ্বিগ্ন। বসে বসে তারা মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছিলেন লেখকের সর্বশেষ অবস্থার খবর। 

কিন্তু শাওন ও মাজহার বেরিয়ে যান। তারা ফিরে আসেন প্রায় দুই ঘণ্টা পর।

উপস্থিত শুভানুধ্যায়ীরা বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করেননি।একটি সূত্রমতে, ড. হুমায়ূন আহমেদ বাসায় পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু একদিন পরে প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় রক্তে সংক্রমণ, যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর কারণ। 

এ গাফিলতির দায়ভার কে নেবে এটাই এখন প্রশ্ন।

বাংলা সাহিত্যের স্রোতধারায় পরিবর্তনের নায়ক হুমায়ূন আহমেদ। নন্দিত এ ভালোবাসার মহানায়ক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন। বিশ্বের সর্বাধুনিক চিকিৎসার জন্য খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রে এলেন আরোগ্য হওয়ার প্রত্যাশায়। নিউইয়র্ক আগেও আসা-যাওয়া করেছেন পাঠক নন্দিত এ লেখক। পরিবেশ ও প্রতিবেশকে সদাচঞ্চল রাখা হুমায়ূন আহমেদ লাশ হয়ে ফিরে গেলেন।

নিউইয়র্ক থেকে গত শনিবার রাতে হুমায়ূন আহমেদের কফিন নিয়ে ফ্লাইট উড্ডয়নের সঙ্গে সঙ্গে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে গেল। নিউইয়র্কের কোনো বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ আর আসবেন না। প্রবাসী কোনো ভক্ত-পাঠক আর কখনো অটোগ্রাফ চেয়ে আবদার জানাবেন না। জীবনের সব হিসাব চুকিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ।

চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে এসে প্রায় ১০ মাস ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। দশ মাস নিউইয়র্কে অনেকটা নীরবেই কেটেছে তার। ক্যানসারের স্পর্শকাতর চিকিৎসার কারণেই নিয়ন্ত্রিত ছিল তার চলাচল। বাংলাদেশি অধ্যুষিত নিউইয়র্কের কুইন্সে ঘর ভাড়া করে চিকিৎসা চলছিল। নির্বিঘœ চিকিৎসা অব্যাহত রাখার জন্যই প্রবাসীদের পক্ষ থেকে অহেতুক বিব্রত করা হয়নি প্রয়াত লেখককে। প্রবাসীদের সব আড্ডা-সমাবেশে হুমায়ূন আহমেদের প্রসঙ্গ এসেছে। সবাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছেন প্রিয় লেখক যেন সেরে ওঠেন। যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।

সব শুভ কামনা ধুলায় মিশে যায়। ১৯ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। পাঠকের মনোজগৎ নিয়ে বহু রহস্য সৃষ্টি করে গেছেন ক্ষণজন্মা এ শব্দের কারিগর। মৃত্যুর আগে ও পরে নিউইয়র্কেও তাকে নিয়ে বেশ কিছু রহস্য, বেশ কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে।চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বদল বিখ্যাত ক্লোন ক্যাটারিং মেমোরিয়েল হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের।

শারীরিক অবস্থার উন্নতিও ঘটেছিল।

ক্যানসার চিকিৎসার জন্য অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ক্লোন ক্যাটারিং মেমোরিয়েল হাসপাতাল। হঠাৎ করেই জানা গেল বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। বেলভিউর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিতি নেই। এখানেই তার অস্ত্রোপচার হলো। অস্ত্রোপচারের আট দিনের মাথায় বাড়ি ফিরলেন হুমায়ূন আহমেদ। 

বাড়িতে শরীরের অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটে।

জ্যামাইকা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ হয়ে আবার বেলভিউ হাসপাতালে গেলেন এবং টানা প্রায় চার সপ্তাহ ওখানে থেকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।অনেকেরই জিজ্ঞাসা, হাসপাতাল পরিবর্তন করা হলো কেন? লোকজন জানতে চেয়েছেন, কারণটা কী ছিল অর্থনৈতিক?

বলা হচ্ছে ক্যানসারের আক্রমণে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু ঘটেনি। ঘটেছে অজানা ভাইরাসের আক্রমণে। এ আক্রমণটা ঘটল কোথায়? হাসপাতালে না নিজের ঘরে? ক্যানসার চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীর জন্য প্রযোজ্য দেখাশোনায় হুমায়ূন আহমেদের বেলায় কোথাও কোনো অবহেলা হয়েছে কী?

নিউইয়র্কে কে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের অভিভাবক?

হুমায়ূন আহমেদ কোনো সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন না। তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর জানার জন্য উদ্বিগ্ন থেকেছে বাংলাদেশের লক্ষ্য কোটি মানুষ। চিকিৎসার জন্য লেখকের সঙ্গে আসা প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম ছিলেন সার্বক্ষণিক। নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন চিকিৎসা থেকে নানা বিষয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছেন মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা। লেখকের শারীরিক অবস্থা জানার জন্য এ দুজনের ওপরই সংবাদকর্মীদের নির্ভর করতে হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দুজনের দেয়া ভাষ্যে ফারাক ছিল বিস্তর।

প্রিয় লেখকের সংকটজনক শারীরিক অবস্থা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনে হিমশিম খেতে হয়েছে সংবাদকর্মীদের। অনেকেই বলেছেন, ১৯ জুলাই সকাল পর্যন্ত মাজহারুল ইসলাম লেখকের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেননি। অনেকেরই জিজ্ঞাসা, কোথাও কী কিছু আড়াল করার চেষ্টা ছিল?

আমাদের ব্যর্থতা নিউইয়র্কের বাংলা সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছেন ঢাকা থেকে।

সংবাদ প্রচার হওয়ার পরও দ্রুত নিউইয়র্কের বাংলা সংবাদপত্রের কর্মীরা হাসপাতালে উপস্থিত হতে পারেননি। হাসপাতালের ভেতর থেকে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেন এবং মাজহারুল ইসলাম নিউইয়র্কের সংবাদকর্মীদের নয়, ঢাকায় ফোন করে সংবাদ দিচ্ছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদকে হাসপাতালে মৃত ঘোষণার পাঁচ ঘণ্টা পর ফিউনারেল হোমে পাঠানো হয়। এ পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে সংবাদকর্মীরা ছাড়া মাত্র তিনজন সাধারণ প্রবাসীকে হাসপাতালের গেটে ভিড় করতে দেখা গেছে।

জ্যামাইকার রকওয়ে বুলেভারের ইসলামিক ফিউনারেল হোমে রাখা হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। 

বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম রোজার প্রস্তুতি এবং তার জানাজার ব্যস্ততা ছিল, ফিউনারেল হোমের মূল ফটকসহ কার্যালয় তালাবদ্ধ ছিল।

রাত ১২টা পর্যন্ত ফিউনারেল হোমে কোনো প্রবাসীকে ছুটে আসতে দেখা যায়নি।

জ্যামাইকার রকওয়ে বুলেভার এবং ১১৬ স্ট্রিটের ঘরে হুমায়ূন আহমেদের পরিবার ছিলেন। সেখানে মধ্যরাত পর্যন্ত মাত্র জন বিশেক মানুষের আগমন ঘটেছে।শুক্রবার সকালে ফিউনারেল হোমে মরদেহ দেখার ব্যবস্থা থাকলেও কোনো প্রবাসী বাংলাদেশিকে সেখানে দেখা যায়নি। শুক্রবার জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের জানাজায় লোকসমাগম নিয়েও কথা উঠেছে।

রমজানের প্রথম জুমার নামাজে একই ধরনের লোকসমাগম হয়ে থাকে বলে অনেকেই জানিয়েছেন। 

জানাজার পর মরহুমের কফিন দর্শনার্থীদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। কিন্তু সেখানে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না।

জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে জানাজার পর কোনো শুভেচ্ছার আয়োজন দেখা যায়নি। যেসব সংগঠন, সমিতির নেতারা অহরহ বিবৃতি দিয়ে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা জানান, তাদেরও দেখা যায়নি। বহু ফুল ফোটানোর মহানায়ক হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ শনিবার দুপুর পর্যন্ত ছিল ফিউনারেল হোমে। প্রবাসী বাংলাদেশি কোনো সংগঠন, নেতা-পাতি নেতাদের সেখানে ফুলের তোড়া নিয়ে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি।

যেসব বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক যোদ্ধা, লেখকের আত্মার আত্মীয় বলে পরিচয় ছিল তাদেরও দেখা মিলেনি। 

শনিবার রাতে জনাবিশেক লোক ছিলেন জেএফকে বিমানবন্দরে।যারা এখন শোকসভার ডাক দেবেন, ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা লিখবেন, তাদের টিকিটিও চোখে পড়েনি হাসপাতাল থেকে ফিউনারেল হোম পর্যন্ত। ফিউনারেল হোম থেকে অস্থায়ী বাড়ি, জানাজা এবং শেষ বিদায়ে জেএফকেতে।

বিমানবন্দরে কমিউনিটির উপস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া ছিল লজ্জাজনকঅনেকেই জানতে চেয়েছেন, প্রিয় লেখককে কেন বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল? নানা কারণে সভা-সমিতি করে যারা নিজেদের মোড়লত্ব জাহির করেন তারাই বা কেন এগিয়ে গেলেন না? যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী দাবি করেন, কুঁজো হয়ে হাঁটেন তারাই বা কোথায় ছিলেন?

নিয়ন্ত্রণহীন অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকেই শেষ দেখা দেখতে পারেননি প্রিয় লেখকের প্রিয়মুখ। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো সমন্বয় ছিল না।

জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছেন ওয়াশিংটনের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের, জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেন।অব্যবস্থাপনা ছিল ফিউনারেল হোমেও শুক্রবার সকাল ৯টায় ইসলামিক ফিউনারেল হোমে গিয়ে মরহুম লেখকের কোনো স্বজনকে পাওয়া যায়নি।

 ফিউনারেল হোমের পরিচালক ব্রুস বেইটস জানান, মরদেহ গোসল করানোর জন্য স্বজনরা অপেক্ষা করছেন। সকাল সোয়া ১০টায় জামাল আবেদীন ও আনিসুর রহমান ফিউনারেল হোমে উপস্থিত হন।

দুজনই মরহুম লেখকের একান্ত স্বজন, প্রথমপক্ষের স্ত্রী গুলতেকিনের নিকট আত্মীয়। অন্য কারো জন্য অপেক্ষা না করে মরদেহ গোসল এবং ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয়। ধর্মীয় নিয়ম-কানুন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলেও প্রিয় লেখকের এ অন্তিম পর্বে আমিও যোগ দেই। নিয়মানুযায়ী সাদা কাফনের শেষ পরিচ্ছদে মুড়িয়ে দেয়া হয় মরহুমের দেহ।

ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া মরদেহ গোসল করানোর আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। ফিউনারেল হোমের উন্মুক্ত টেবিলে চিরচেনা লেখকের নিথর দেহ দেখে মুষড়ে পড়ার অবস্থা। আমার থর থর কাঁপ এবং অঝোর কান্না দেখে জামাল আবেদীন আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। আমরা তিনজন তখন দোয়া-দরুদ পড়ছিলাম। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই মরদেহ কফিনে রেখে দেয়া হয়। ফিউনারেল হোমে পারিবারিক দর্শনার্থী ফিউনারেল হোমে পারিবারিক দর্শনার্থীদের জন্য কফিনে রাখা হলেও দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোনো স্বজন বা পরিবারের লোকজন আসেননি। এখানে একটি প্রার্থনা কক্ষ থাকলেও ধর্মীয় কোনো আয়োজনও ছিল না ফিউনারেল হোমে। মরহুম লেখকের জন্য ছিল না কোনো দোয়া কালামের ব্যবস্থা।

হলরুমে কফিনের মধ্যে লাশ পড়ে আছে একটা। কেউ নেই কিছু বলার। আমরা মাত্র চারজন বসে আছি। 

এরই মধ্যে ফিউনারেল হোমে পৌঁছে গোছেন বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবু তাহের। নীরব নিথর হুমায়ূন আহমেদের কফিন পড়ে আছে। কেউ নেই দেখার। আমরা চারজন পাশে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম দোয়া-দরুদ করার। তারপর তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় প্রথম মোনাজাত করি আমরাই। কেউ নেই। 

তাই শেষ পর্যন্ত বাংলা পত্রিকা সম্পাদক আবু তাহেরকে অনুরোধ করা হয় মোনাজাত পরিচালনার জন্য। 

মাত্র চারজন মিলে আমরা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করি।

বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পর হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন তার মা তহুরা আলী, দুই পুত্র নিনিত ও নিশাদকে নিয়ে ফিউনারেল হোমে পৌঁছেন।মেহের আফরোজ শাওন মরহুম হুমায়ূন আহমেদের কফিনে ধরে বিলাপ করতে থাকেন ‘জিম জিম-তুমি চলে গেলে/তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে’। 

হুমায়ূন আহমেদকে সম্ভবত ‘জিম’ নামেই ডাকেন তার স্ত্রী শাওন।

শাওন বলছিলেন, ‘জিম তুমি বলতে কুসুম আমার চোখ বুলিয়ে দাও (শাওনকে হুমায়ূন আহমেদ ‘কুসুম’ বলেই ডাকতেন)’। শাওন বলেন, ‘দেখো জিম, আমি তোমার চোখ বুলিয়ে দিচ্ছি।’ শাওন বিলাপ করতে থাকেন, ‘জিম আমি রাখতে পারলাম না।’ এ সময় শাওনের মা তহুরা আলী মেয়েকে সান্ত¡না দিয়ে বলছিলেন, ‘দুই সন্তানের জন্যই তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। মন শান্ত করো মা।’

নিশাদ ও নিনিত দুই সন্তান নিশাদ ও নিনিত শেষ দেখা দেখেছে ওদের বাবা কোটি জনতার প্রিয় মানুষ হুমায়ূন আহমেদকে। ফিউনারেল হোমে মা ও নানীর সঙ্গে নিয়ে এলে তারা শুধু দেখছিল। বাবাকে ‘বাই বলো, বাবার কাছ থেকে বিদায় নাও’বলছিলেন মা মেহের আফরোজ শাওন। পলকহীন অবুঝ দুই শিশুপুত্র তখন কেবল এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল।
ছবি ওঠানো বারণ

হুমায়ূন আহমেদের কফিনে বিলাপরত তার স্ত্রী ও স্বজনদের ছবি গ্রহণের উদ্যোগ নেই। ফিউনারেল হোমের পরিচালকের কাছ থেকে প্রথম জেনে নেই ছবি তুলতে কোনো বাধা আছে কি না। ক্যামেরায় ছবি ধারণ করতেই ক্ষুব্ধ মেহের আফরোজ শাওন ছুটে এসে আমার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেন। তার মা তহুরা আলী উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ নিষেধ করে গেছেন কোনো ছবি যেন ওঠানো না হয়।’ প্রয়াত লেখকের নিষেধের কথা আমার জানা নেই বলে তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশ করা হয়। ধারণ করা সব ছবি মুছে ফেলে আমার ক্যামেরা ফেরত দেয়া হয়।

অসুস্থ অবস্থায় প্রয়াত লেখকের সঙ্গে সার্বক্ষণিক থাকা মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, ছবি ওঠানোর ব্যাপারে নিষেধের কথা হুমায়ূন আহমেদ বলে যাননি। মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগে থেকেই তো তিনি কিছু বলতে পারছিলেন না।

মরদেহ ফিউনারেল হোমে রেখে অপ্রীতিকর আচরণ মাত্র সাতজন পারিবারিক দর্শনার্থীদের সুশৃঙ্খল থাকার জন্য বলছিলেন সকাল থেকে ফিউনারেল হোমে উপস্থিত জয়নাল আবদীন। তার দিকে হঠাৎ তেড়ে আসেন প্রয়াত লেখকের বন্ধু বলে পরিচিত ফানসু ম-ল। স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের সঙ্গে আসা ফানসু ম-ল এবং জয়নাল আবেদীনের মধ্যে ‘তুমি কে, তা আমি দেখে নেবো’ ইত্যাদি বাক্যবিনিময় শুরু হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ফিউনারেল হোম কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়। মরদেহ দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে জানাজা শেষ হওয়ার পরও মরহুম দেশে ফেরার সময় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসা করা হলে সবাই বলছিলেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চলছে, শুক্রবার রাতেই যেন ফ্লাইট ধরানো যায়। সমন্বয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা জানান, কার্যত সব টিকিট প্রথম শ্রেণীর না পাওয়ায় বিলম্ব হচ্ছিল।

মরদেহের সঙ্গে যারা ঢাকা যাবেন তারা নাকি প্রথম শ্রেণী ছাড়া ভ্রমণ করবেন না। অথচ হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই ড. জাফর ইকবাল ইকোনমি ক্লাসে ওইদিন ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন।

জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ তখন ফিউনারেল হোমের হিমাগারে। জীবদ্দশায় তার ভ্রমণে প্রথম শ্রেণীর চাহিদা সবসময় ছিল কি না জানি না। তবে লাখো জনতার অপেক্ষা ও উৎকণ্ঠায় স্বদেশ তখন প্রিয় লেখকের কফিনের অপেক্ষায়।

Tuesday, July 24, 2012

শাওনের বক্তব্য নিয়ে নিউ ইয়র্কে তোলপাড়

হুমায়ন আহমেদ তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফনের কথা বলে গেছেন, মেহের আফরোজ শাওনের এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাদের ঘনিষ্ঠ নিউ ইয়র্ক প্রবাসী কয়েকজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আব্দুল মোমেনের স্ত্রী সেলিনা মোমেন শাওনের বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, শনিবার হুমায়ন আহমেদের মরদেহ দেশে নিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে জেএফকে এয়ারপোর্টে প্রকাশ্যে মেহের আফরোজ শাওন লাশ দাফনের ব্যাপারে হুমায়ুন আহমেদ কিছু বলে যাননি বলে জানান।

সেলিনা মোমেন বলেন, শাওনকে এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সেখানে আমি, হুমায়ুন আহমেদের চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্ঠ মুক্তধারা নিউইয়র্কের প্রধান বিশ্বজিৎ সাহা, তার স্ত্রী রুমা সাহা এবং সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সাবেক চীফ রিপোর্টার ও ইটিিিভর নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি শাখাওয়াত হোসেন সেলিম উপস্থিত ছিলেন।

সবার সামনেই তাকে লাশ দাফনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শাওন বলেন, হুমায়ুন আহমেদ এবিষয়ে কিছুই বলে যাননি। এজন্য দেশে গিয়েই সিদ্ধান্ত হবে।

এবিষয়ে সাংবাদিক শাখাওয়াত হোসেন সেলিম বলেন, শাওন বললেন, হুমায়ুন আহমেদ কিছু বলে যাননি। তাই তিনি বলতে পারছেন না দাফন কোথায় হবে। তার এ্ই কথা রেকর্ড করতে গেলেই বাঁধা দেন শাওনের মা তহুরা আলী। তিনি বলেন, এখন কোন কথা রেকর্ড করা যাবে না। শাওনকে তিনি বারণ করেন এবিষয়ে কোন কথা না বলতে।

এবিষয়ে হুমায়ুন আহমেদের চিকিৎসার সাথে জড়িত প্রধান ব্যক্তি বিশ্বজিৎ সাহার বত্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, শাওনের বক্তব্য আমাকে বিস্মিত ও স্থম্ভিত করেছে। কারণ এয়ারপোর্টে তিনি প্রকাশ্যে বললেন, লাশ দাফনের বিষয়ে হুমায়ুন আহমেদ কিছুই বলে যাননি। কিন্তু দেশে গিয়েই তিনি একেবারেই উল্টো কথা বললেন।

গত ৯ মাস আমরা চিকিৎসার স্বার্থে কাছাকাছি ছিলাম। কিন্তু শাওন এধরনের কথা কখনো বলেনি। ড. হুমায়ুন আহমেদও আমাদের দাফন নিয়ে কোন নির্দেশনা দেননি।

বিশ্বজিৎ সাহার স্ত্রী রুমা সাহা বলেন, আমরা স্যারের মরদেহ ও শাওনকে বিদায় দিতে এয়ারপোর্ট গেলাম। সেখানে শাওন সবার সামনেই বলেছেন, স্যার দাফনের বিষয়ে কোন কিছু বলে যাননি। এখন তিনি একেবারেই অন্য কথা বলছেন। অবশ্য এ সময় তার মা তহুরা আলী এসে তাকে থামিয়ে দিয়ে নিয়ে যান বলে জানান। 

 

Saturday, May 19, 2012

জনতাকে লক্ষ্য করে এমপি গিয়াস উদ্দিনের গুলি

বিক্ষুব্ধ দলীয় সমর্থক ও এলাকাবাসী ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের সাংসদের গাড়ি ভাংচুর করলে এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। ঘটনাটি ঘটে গতকাল শুক্রবার উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের কান্দিপাড়া বাজারে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় গফরগাঁও-টোক সড়ক দিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ঢাকা থেকে গফরগাঁও উপজেলা সদরে যাওয়ার পথে কান্দিপাড়া বাজারে গাড়ি থামিয়ে দলীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমপি কান্দিপাড়া এসেছেন_ এ খবর শুনে মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হয় শত শত দলীয় ও স্থানীয় লোকজন। তারা এমপিকে ঘেরাও করে। সদ্য ঘোষিত পাগলা থানার স্থান পরিবর্তনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে তারা। এ অবস্থায় এমপি গাড়ির গল্গাস খুলে উপস্থিত লোকজনকে ধমকান এবং গালাগাল করেন। এতে লোকজন উত্তেজিত হয়ে এমপির গাড়ির পেছনের গ্গ্নাস ভাংচুর করে। তখন ক্ষুব্ধ এমপি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ গাড়ির জানালা দিয়ে নিজস্ব পিস্তল থেকে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে গুলি করেন। এতে লোকজন আরও উত্তেজিত হয়ে ফের এমপির গাড়ি ভাংচুর করে। এ অবস্থায় তিনি গাড়ি থেকে নেমে লোকজনকে লক্ষ্য করে আবারও গুলি করেন। পরে স্থানীয় মুরবি্বরা এগিয়ে এসে ঘটনা সামাল দেন। সেখান থেকে এমপি গিয়াস উদ্দিন উপজেলা সদরের সরকারি ডাকবাংলোতে অবস্থান নেন। অন্যদিকে এমপির গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক কান্দিপাড়া বাজারে দলীয় ও স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় আতঙ্কে বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাত সাড়ে ১২টায় কান্দিপাড়া বাজারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে উস্থি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শফিউল বাশার মনি জানান, 'সদ্য ঘোষিত পাগলা থানার স্থান পরিবর্তনের দাবিতে পাঁচ ইউনিয়নের লোকজন আন্দোলন করছে। এমপি সাহেব এ আন্দোলনে কোনো কর্ণপাত না করায় এ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।' অপরদিকে এমপি সমর্থিত লংগাইর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক লিয়াকত আলী মণ্ডল সমকালকে বলেন, 'সন্ত্রাসীরা এমপিকে হত্যা করার জন্য তার গাড়িতে হামলা ও ভাংচুর করে।' তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার প্রতিবাদে রাত ৯টায় স্থানীয় বাজারে এক প্রতিবাদ সভা হয়। গফরগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শী যুবলীগ কর্মী সিদ্দিকুর রহমান রাসেল বলেন, 'এমপি সাহেব গাড়িতে বসে এবং গাড়ি থেকে নেমে দু'বার গুলি করেন।'

পরে এমপি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ উপজেলা সদরের ডাকবাংলোয় অবস্থান নিয়ে তার দলীয় সমর্থকদের জড়ো করেন। রাত ৯টায় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান বাবুলের নেতৃত্বে ২০-৩০টি মোটরসাইকেল বহর সশস্ত্র অবস্থায় কান্দিপাড়া বাজারে যায় এবং কান্দিপাড়া বাজার চৌরাস্তায় সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সভা করে। এতে বক্তব্য দেন মতিউর রহমান বাবুল, লিয়াকত আলী মণ্ডল, মোফাজ্জল হোসেন সাগর, মাহতাব উদ্দিন সাদেক প্রমুখ। অন্যদিকে রাত সাড়ে ৯টায় সতরবাড়ি বাজারে এমপির সমর্থকরা লংগাইর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি এম হককে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেল্গক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিন পথচারীকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলো_ বকুল মিয়া, তানজিব ও কামরুল। এ বিষয়ে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, 'আমি ঢাকা থেকে গফরগাঁও যাওয়ার পথে কান্দিপাড়া বাজারে একটি পথসভা করি। পথসভা শেষে গফরগাঁও ফেরার পথে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালায়। এ সময় আমি ফাঁকা গুলি করলে তারা পালিয়ে যায়।'

এলাকাবাসী জানান, এলাকার উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, পরিবহনে চাঁদাবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগসহ সবকিছু এমপির একক নিয়ন্ত্রণে। খোদ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এমপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ তুলেছেন। ডাকবাংলো, রেলওয়ে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখলের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এসব নানা জনবিরোধী তৎপরতার কারণে এলাকার একটি বড় অংশ এমপির ওপর ক্ষুব্ধ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এমপি হওয়ার পর এলাকার জন্য তেমন কোনো উন্নয়ন কাজ করেননি গিয়াস উদ্দিন। এমপির বিরুদ্ধে কথা বললেই হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতারাও। এমপি গিয়াসউদ্দিন অবশ্য দাবি করে আসছেন, তিনি দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিলেন না। 

Tuesday, May 1, 2012

ইলিয়াসের স্ত্রীর প্রতি শ্রম প্রতিমন্ত্রী আপনার স্বামীর খুনি কে প্রধানমন্ত্রীকে খুলে বলুন (ভিডিও)

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, ‘ইলিয়াসের বিধবা স্ত্রী জানেন, তাঁর স্বামীর প্রকৃত খুনি কে।’ ‘আপনার স্বামীর খুনি কে’ তা প্রধানমন্ত্রীকে খুলে বলার জন্য ইলিয়াস আলীর স্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। আজ মঙ্গলবার সকালে ওসমানী মিলনায়তনে মে দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তিনি এ কথা বলেন। এ অনুষ্ঠানটি টিভি ও রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

মন্নুজান বলেন, ‘ইলিয়াসের বিধবা স্ত্রী যখন টেলিভিশনে কথা বলেন, তখন মনে হয় তিনি অনেক কথা জানেন, কিন্তু বলতে পারছেন না।’ ইলিয়াসের স্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনি জানেন, আপনার স্বামীর খুনি কে, কারা তাঁকে অপহরণ করেছিল। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা, তিনি কোনো দিন এ কাজ করতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনাকে ডেকেছেন, তাঁর কাছে সব খুলে বলুন। আশা করি, আপনার স্বামীর খুনিরা ধরা পড়বে।’

শ্রম প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময় মিলনায়তনের ভেতরে প্রথম সারিতে বসে থাকা সরকারের মন্ত্রী, সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের কানাকানি করতে দেখা যায়।

মন্নুজান সুফিয়ান আরও বলেন, নিজামী-মুজাহিদদের টাকা দিয়ে হরতাল করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা নেতা-কর্মীর হাতে এক-দেড় হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে মাঠে আনা হচ্ছে। তিনি হরতালের আগের দিন বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুড়ে মারা যাওয়া চালক বদর বেগের হত্যার বিচার দাবি করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া পাকিস্তানিদের মেহমান ছিলেন। তাই এখন তিনি দেশের উন্নয়ন চান না। সচিবালয়ে বোমা মারেন, গাড়ি পোড়ান।


Saturday, April 28, 2012

সেই হারুন এখন এসপি : বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে মারধর করায় পদোন্নতি!

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ২০তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে মেধাতালিকায় ৮৭তম অবস্থানে আছেন। ৪৩ জনকে ডিঙিয়ে তিনি পেয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপারের চলতি দায়িত্ব। তাঁর পরের ব্যক্তি পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মনিরুজ্জামান। ৪৪ জনকে ডিঙিয়ে তাঁকে লক্ষ্মীপুর জেলার পুলিশ সুপারের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


অভিযোগ উঠেছে, এভাবে অনিয়ম ও দলীয়করণের মাধ্যমে ৩৬ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে পুলিশ সুপারের চলতি দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তার অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও আছে। কেউ কেউ সাময়িক বরখাস্ত হন।


এখন চলতি দায়িত্বে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা পরে পুলিশ সুপারের পদে স্থায়ী নিয়োগ পাবেন। এ কারণে এ ধরনের পদায়নকে পদোন্নতি হিসেবে ধরা হয়।


অভিযোগ আছে, হারুন অর রশিদ তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার থাকার সময় গত বছরের ৬ জুলাই সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে মারধর করেছিলেন। এ ঘটনা ওই সময় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। ফারুককে মারধর করার ‘পুরস্কার’ হিসেবে ৪৩ জনকে ডিঙিয়ে হারুনকে এসপির পদ দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের মধ্যেই আলোচনা হচ্ছে।


পুলিশ সূত্র জানায়, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে মারধরের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল জলিল এ কমিটির প্রধান। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো তদন্তই হয়নি। এ বিষয়ে কেউ মন্তব্যও করতে চাননি।


হারুন অর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, কিছুদিন আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছেন। তাঁর ফোন বন্ধ রয়েছে।


২২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে ৫৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি ও নিয়োগের আদেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই তালিকায় ২০তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কর্মকর্তা আছেন ৩৬ জন। তাঁদের পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, দলীয় বিবেচনায় পছন্দের তালিকা ধরে পদায়ন করা হয়েছে।


পুলিশ সূত্র জানায়, এ নিয়ে এই ব্যাচের ১৭ জন কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁরা হারুনসহ অনেকের পদোন্নতি নিয়ে আপত্তি তোলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, অনিয়মের অভিযোগের কারণে পদোন্নতির তালিকাটি এক দফা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর দীর্ঘদিন এটি ঝুলে ছিল। পরে কয়েকজন কর্মকর্তা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি বাড়ি ঘুরে নিজেদের পছন্দের নাম যুক্ত করেন।


পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পদোন্নতি ও বদলি নিয়ে সব সময় অভিযোগ ওঠে। এটা নতুন কিছু নয়। পদোন্নতির জন্য একটি কমিটি আছে, সেই কমিটিই সব ঠিক করে। এবার কিছু কর্মকর্তা বাদ পড়েছেন, আগামীতে তাঁরা পদোন্নতি পাবেন। এতে কোনো অনিয়ম হয়নি।’


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এবারের পদায়ন নিয়ে পুলিশ বিভাগে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর আগে এত অনিয়ম হয়নি। পদোন্নতি পাওয়া দুই কর্মকর্তা সম্প্রতি সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে যান। 

তাঁদের সঙ্গে পদোন্নতিবঞ্চিত এক কর্মকর্তাও ছিলেন। তাঁরা বলেন, ৩৬ জনকে পদায়ন করা হলেও মেধাতালিকায় চতুর্থ আনিছুর রহমান ও পঞ্চম বরকতুল্লাহ খানকে পদায়ন করা হয়নি। বরকতুল্লাহ বিগত সরকারের সময়ও বঞ্চিত ছিলেন। অভিযোগ শুনে ওই পদস্থ কর্মকর্তা নিজেও হতবাক হয়ে বলেন, বরকতুল্লাহর নাম তালিকায় ছিল। কিন্তু কেন শেষ মুহূর্তে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন না।


ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ নুরুল ইসলাম মেধা তালিকায় ৬৫তম অবস্থানে আছেন। ৩৫ জনকে ডিঙিয়ে তাঁকে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনারের চলতি দায়িত্বে পদায়ন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আরেক নেতা মনিরুজ্জামানকে একইভাবে পদায়ন করা হয়েছে।


দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। তবু তাঁকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এসপির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় মামলা চলছে এ কে এম এহসান উল্লাহর বিরুদ্ধেও। তাঁকে হাইওয়ে পুলিশের (পশ্চিম) পুলিশ সুপার পদে (চলতি দায়িত্ব) পদায়ন করা হয়েছে।


যোগাযোগ করা হলে সাবেক আইজিপি এ এস এম শাহজাহান বলেন, পুলিশের নিয়োগ ও পদোন্নতি মেধার ভিত্তিতে করতে হবে। তা না হলে ভালো পুলিশ গড়ে উঠবে না। দলীয় পরিচয় পদোন্নতির মাপকাঠি হলে পুলিশের সংস্কার আর কোনো দিনই হবে না।